শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

সংগ্রামে সাংবাদিকতার দিনগুলো

মো: সাজ্জাদুল ইসলাম

থমাস হেস্ট্রিক লিভস বলেছেন, মিথ্যা খবর খুবই সস্তা হয়ে থাকে, এগুলো তৈরি করা খুব সহজ। কিন্তু সত্যিকারের খবর খুঁজে বের করা খুব কঠিন একটা কাজ।’ আর লর্ড নর্থক্লিপ বলেছেন, সত্যিকারের খবর হল যা কেউ চাপা দিতে চায়, বাকি সব বিজ্ঞাপন।’ খবর বা সংবাদ নিয়ে দুই মনীষীর উক্তি দিয়েই আজকের লেখাটা শুরু করতে চাই। সাংবাদিকরা খবর সংগ্রহ ও পরিবেশনের এমন দুরূহ কাজই কাঁধে তুলে নেন। এ পেশা যেমন দায়িত্বপূর্ণ তেমনি কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ এবং আনন্দদায়কও।

আমাদের সময়ে স্কুল জীবনে নানা বিষয়ে রচনা পড়তে হতো, তার একটি ছিল সংবাদপত্র। সে আমলে সংবাদপত্র বলতে দৈনিক, সাপ্তাহিক-পাক্ষিক ও মাসিক পত্রপত্রিকা এবং রেডিওকেই বুঝানো হতো। তাতে বলা হতো, ‘সংবাদপত্র হল জ্ঞানের আধার, পৃথিবীর চলন্ত আয়না।’ আজ সংবাদ মাধ্যম বিচিত্র শাখাপ্রশাখায় বিস্তৃত হয়েছে। হাতের মোবাইলে নিমিষে দেশবিদেশের সব ঘটনা লাইভ জানা যাচ্ছে।

সংবাদপত্রের প্রতি গভীর আগ্রহ থেকে সাংবাদিকতা পেশায় আসা। নিজ শহর মাগুরায় ডিগ্রি পড়ার সময় দৈনিক সংগ্রামের সৌখিন জেলা সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছি ১৯৭৮-৭৯তে। সে সময়ে অনেক কষ্ট করে সংগ্রহ করা একটি খবর ছাপা না হওয়ায় বেশ কষ্ট পেয়েছিলাম। আমাদের জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায় সক্রিয় সর্বহারা দল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একদল ছিল মনিপীরপন্থী আর অন্যদল আব্দুল হকপন্থী। মাগুরা শহর থেকে প্রায় à§§à§« মাইল দূরে প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায় কয়েকজন গরু ব্যবসায়ী হাট থেকে ফেরার পথে রাতে ডাকাতির শিকার হন। তারা ডাকাতদের চিনতে পারেন। তারা ছিল মনিপীরপন্থী সর্বহারার সদস্য। সশস্ত্র এসব ডাকাতদের বিরুদ্ধে তাদের করার কিছু ছিল না। অবশেষে ব্যবসায়ীরা সাহস করে তাদের নেতাদের কাছে ঘটনা জানিয়ে বিচার চান। নেতারা তাদের বিচার করার কথা দেন। বেরইল গ্রামে আমবাগানে প্রকাশ্যে এ বিচার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আমি শহর থেকে বাইসাইকেল চালিয়ে গ্রামটিতে যাই খবর সংগ্রহ করতে। সেখানে পথে দেখলাম সর্বহারারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একরকম রণসাজে অবস্থান করছেন। নেতারা সেদিন শুনানির পর বিচার মূলতবি করে পনের দিন পর নতুন দিন ঠিক করেন। পনের দিন পর আবার সেখানে যাই। বিচারের রায়ে দোষীদেরকে জরিমানা করা হয়। গ্রামবাসি এ রায়ে খুশি হতে পারেননি। তারা আমাকে বলেন, ‘ওরা তো আবার ডাকাতি করে এ জরিমানার অর্থ শোধ করবে।’ 

অস্ত্রধারী সর্বহারার কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা হয়। জানতে চাই, কী করতে চান আপনারা? তেমন কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তারা। মার্কসবাদ কী তাও অনেকে জানেন না। তবে অস্ত্রধারীদের দলে গেলে অর্থের সংস্থান হওয়ার পাশাপাশি নিজেকে একজন বীর মানুষ মনে হয়, সম্ভবত যৌবনের এ অনুভুতি থেকেই সর্বহারা দলে যোগ দিয়েছিলেন গ্রামে শিক্ষা বঞ্চিত অনেক তরুণ। দলটির নেতাদের আয়ের উৎস ছিল অবস্থাপন্ন লোকদের থেকে চাঁদা আদায়। এখন অবশ্য তাদের কোন তৎপরতা আর এসব অঞ্চলে চোখে পড়ে না। 

১৯৮৫ সালের দিকে দৈনিক সংগ্রামে সাব এডিটর হিসেবে যোগ দেই। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরের দিন মৌখিক পরীক্ষা দিতে হয়। মৌখিক পরীক্ষার সংগ্রামের সম্পাদক আবুল আসাদ এবং প্রকাশক মরহুম হুমায়ুন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। হুমায়ুন আহমদ বলেন, আপনি কি সাংবাদিকের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন আছেন? পরে নিজেই উত্তর দেন, ‘আপনি যদি দেখেন, ভূমিকম্পে ঢাকা শহর বিধ্বস্ত হয়েছে। আপনি যদি বেঁচে যান তাহলে আপনাকে পত্রিকা অফিসে এসে ওই খবর জানানোর দায়িত্ব পালন করতে হবে।’ 

শহীদ কামারুজজামান ছিলেন সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদক। ছাত্রজীবনে উনার সঙ্গে পরিচয় ছিল। উনাকে বললাম, আমি শিক্ষকতা করি, রাতের শিফটে কাজ করতে চাই। ছয় মাস পর শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দেব। উনি সম্মতি দেন। সাবএডিটরদের বসার ব্যবস্থা সংগ্রাম অফিসের দোতালার পূর্বাংশে আর পশ্চিমাংশে ছিল রিপোর্টার্সদের বসার ব্যবস্থা। একটা রাউন্ড টেবিলের চারপাশে গোল হয়ে বসতো সাবএডিটররা আর মাঝখানে বসতেন শিফট-ইন-চার্জ। আমি যখন যোগদান করি তখন দুই জন শিফট-ইন-চার্জ ছিলেন শেখ এনামুল হক এবং কাজী হাফিজুর রহমান। নিউজের উৎস ছিল বাসসের বসানো টেলিপ্রিন্টারের আসা দেশবিদেশের খবর এবং রিপোর্টারদের সংগ্রহ করা খবর। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলসমূহ ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রেস বিজ্ঞপ্তি। শিফট ইনচার্জ টেলিপ্রিন্টারে আসা অসংখ্য খবর থেকে গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো আমাদেরকে দিতেন অনুবাদ করার জন্য। একই টেবিলে সে সময় সহকর্মী হিসেবে যাদেরকে পেয়েছিলাম তার হলেন, সাদাত হোসাইন, বাকের হোসাইন, মরহুম মাহমুদুল হক দুলাল, আহমদ মতিউর রহমান, ওয়ালিউল হক, মুজতাহিদ ফারুকী, মরহুম আহমদ আখতার। এই টেবিলের পেছনে বসতেন যুগ্ম বার্তা সম্পাদত মরহুম আব্দুল কাদের ভাই। বার্তা সম্পাদক ছিলেন মো: কবিরুল ইসলাম।

চিফ রিপোর্টার ছিলেন সালাহউদ্দিন মোহাম্মাদ বাবর, যিনি এখন দৈনিক নয়াদিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক, সিনিয়র রিপোর্টারদের মধ্যে ছিলেন, আনোয়ার হোসাইন মঞ্জু, আযম মীর, মরহুম রুহুল আমিন গাজী, মিজবাহ ভাই আরও অনেকে।

মফস্বল সম্পাদক ছিলেন মরহুম কাজী শামসুল হুদা। তাকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই মাগুরায় সংবাদদাতা থাকাকালে আমার পাঠানো সর্বহারাদের বিচার সংক্রান্ত খবরটি ছাপালেন না কেন? তখন খবর সাধারণত হাতে লেখে ডাকযোগে পাঠানো হতো। আর জরুরী হলে টেলিগ্রাম বা টেলিফোনে করতে হতো। একই খামে অনেকগুলো খবর পাঠানো হতো। যে খামে আমি ওই খবরটি পাঠিয়েছিলাম তাতে অন্য কয়েকটি খবর ছিল যা ঠিকই ছাপা হয়েছিল। হুদা ভাই বললেন, সংবাদদাতার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ওই খরবটি আমরা ছাপাইনি। দোতালার দক্ষিণের দিকে ছিল সম্পাদকের দপ্তর ও সম্পাদকীয় বিভাগ। সহকারী সম্পাদক হিসেবে তখন কাজ করতেন জুলফিকার আহমদ কিসমতি, জয়নুল আবেদীন আজাদ, সাজজাদ হোসাইন খান, আমীর খাসরু, ইসমাঈল হোসেন দিনাজী। কবি আল মাহমুদও সংগ্রামের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেছেন।

রাতের শিফটের কাজ শুরু হতো সে সময় আটটার দিকে। রাত একটার দিকে শেষ হতো। শিষায় খোদাই করা অক্ষরে খবর কম্পোজ করা হতো। হেডলাইন বসানো হতো বড় বড় কাঠের হরফে। খবরের কাগজের বার্তা কক্ষ সব সময় জমজমাট থাকতো। কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলতো হাল্কা আলাপচারিতা। দেশবিদেশের বড় বড় ঘটনার সাক্ষী হন সাংবাদিকরা। ১৯৯১ সালের ২১শে মে রাতের কাজ আমাদের শেষ হয়ে গেছে। বার্তা সম্পাদক কবির ভাই ডামি এঁকে ফেলেছেন। অল্পপরেই মেকআপ শুরু হবে। আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম। এমন সময় টেলিপ্রিন্টার শব্দ করে উঠলো। তারপর খটখট টাইপের শব্দ। আমি ছুটে গেলাম কী খবর আসে দেখতে। শিরোনাম দেখে তো বিস্মিত, ‘রাজিব গান্ধী কিল্ড’ ডেটলাইন মাদ্রাজ, সূত্র পিটিআই। একাংশ ছিঁড়ে এনে কবির ভাইকে বললাম কবির ভাই আপনার ডামি ভাঙতে হবে, বড় খবর এসেছে, রাজীর গান্ধী নিহত হয়েছেন। 

 à¦Ÿà§‡à¦¬à¦¿à¦²à§‡ থাকা কয়েকজন মিলে দ্রুতগতিতে খবরটা তরজমা করে দিলাম। সেদিনের পত্রিকার শিরোনাম ছিল ওই খবরটি। এ রকম অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম সংগ্রামে চাকরির ২০ বছরে।  এরপর ২০০৪ সালে নয়াদিগন্ত পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বাবর ভাই ওই পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হন। সংগ্রামে থাকতে উনি আমাকে বলেছিলেন, ‘আমরা একটা ভাল মানের পত্রিকা বের করতে চাই। আপনিও নয়াদিগন্তে আমাদের সাংবাদিক টিমে থাকবেন।’ রাজী হয়ে যাই।

ওই বছর সেপ্টেম্বরে সংগ্রামের শিফট-ইন-চার্জের পদ থেকে ইস্তফা দেই। যোগদান করি নয়া দিগন্তে। সাংবাদিকতায় অবসর গ্রহণের বিধান আগে ছিল না। কিন্তু পরে এটি চালু করে বিভিন্ন পত্রিকা। নয়াদিগন্তের দায়িত্বশীলরা ওই পথে পা বাড়ান। বয়স ৬০ বছর পার হওয়ায় ২০১৮ অবসর দেওয়া হয় আমাদের মতো সিনিয়র অনেককে।

আমরা যখন দৈনিক সংগ্রামে যোগদান করি তখন সংগ্রাম ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পত্রিকা। প্রচার সংখ্যাও ছিল বিপুল। ভাল সাংবাদিকরা এখানে কাজ করতেন। পরে বাজারে নতুন নতুন পত্রিকা আসে। আসে নতুন নতুন প্রযুক্তি। যোগ হয় বিপুল বিনিয়োগ। সংগ্রাম নানা টানাপড়েন ও রাজনৈতিক নিষ্পেষণে জৌলুস অনেকখানি হারিয়ে ফেলে। তবুও পথ চলা থেমে থাকেনি। আমরা অনেকেই সংগ্রামের দরজা দিয়ে সাংবাদিকতার মহান পেশায় প্রবেশ করেছি, আমাদের কাছে আজও সংগ্রাম একান্ত নিজের হাউজ।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ